৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে ভারতে পালানোর পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতা তানভীরের কথোপকথনের একটি অডিও সম্প্রতি ফাঁস হয়েছে। এই কথোপকথন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং শেখ হাসিনার বর্তমান অবস্থান নিয়ে এক অনবদ্য অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।
তানভীর ও শেখ হাসিনার আলাপচারিতায়, তানভীর জানান যে নিউইয়র্ক মহানগরে এমদাদ ভাইয়ের নেতৃত্বে একটি মিটিং-মিছিল চলছে। তিনি উল্লেখ করেন যে কামরাঙ্গীর চর ও কেরাণীগঞ্জের নেতাকর্মীরা বর্তমানে এলাকায় নেই এবং পরিস্থিতি বেশ খারাপ। এর উত্তরে শেখ হাসিনা বলেন, "সব মার্ডার কেস। সবার বিরুদ্ধে মার্ডার কেস।" এই মন্তব্য থেকে পরিষ্কার হয় যে শেখ হাসিনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং তার দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।
তানভীর আরও বলেন, “এলাকার ছাত্রলীগ-যুবলীগকে আমি সহায়তা করছি। আপনি যদি বলেন তুমি এখানে থেকে ওদের হেল্প করো, করলাম। আর যদি বলেন তুমি দেশে গিয়ে দল গোছানোর চেষ্টা করো তাহলে করবো আপা।” শেখ হাসিনা নির্দেশ দেন, “এখানে বসে এখন সাহায্য করো। এটাই সবচেয়ে বেশি কাজে লাগবে। দেশে পরে গেলেও হবে।” এর মাধ্যমে, শেখ হাসিনা পরিস্থিতির সামাল দেওয়ার জন্য প্রাথমিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থেকে সহায়তা চালানোর নির্দেশ দেন।
অডিও ক্লিপে তানভীর আইনজীবীদের সমস্যার কথা উল্লেখ করেন এবং শেখ হাসিনা আইনজীবীদের লোকজনকে সংগঠিত করার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি, তানভীর যুক্তরাষ্ট্রে চলমান নির্বাচনের ক্যাম্পেইনিংয়ে সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে জানান যে ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনে জয়ী হলে তাদের জন্য এটি ভালো হবে। শেখ হাসিনা তার মন্তব্যে বলেন, “সে যেই আসুক। তাদের ক্যাম্পেইনিংয়ে থাকলে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হলে ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।” এই বক্তব্যটি শেখ হাসিনার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার প্রতি তার বিশ্বাসকে প্রতিফলিত করে।
এরপর, তানভীর খবর দেন যে শেখ হাসিনাকে গাজিয়াবাদ থেকে দিল্লিতে হেলিকপ্টারে সরানো হয়েছে। শেখ হাসিনা অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন, “হেলিকপ্টার দিয়ে? কোন দেশের হেলিকপ্টার?” তিনি আরও বলেন, “আমি দেশের খুব কাছাকাছি আছি। অতদূরে নাই। আমি খুব কাছাকাছিই আছি, যাতে আমি চট করে ঢুকে পড়তে পারি।” এই কথোপকথন থেকে স্পষ্ট হয় যে শেখ হাসিনা তার নিরাপত্তা এবং অবস্থান নিয়ে আতঙ্কিত হলেও নির্ভীক এবং আত্মবিশ্বাসী ছিলেন।
তানভীর কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আপা কষ্ট লাগে, আপনি যে মিডিয়াদের দিয়ে আসছেন, এরা সত্য বলে না, এরা কাজ করে না আপা।” এরপরে, তিনি শেখ হাসিনাকে আশ্বস্ত করেন যে, “যখন নির্দেশ দেবেন, তানভীর তুমি আমেরিকা থেকে দেশে চলে আসো, এসে কামরাঙ্গীর চর-কেরাণীগঞ্জে দলীয় নেতৃত্ব গোছাও, আপনি বললে সাথে সাথে দৌঁড় দেব আপা।” শেখ হাসিনা এ সময় বলেন, “এখন গেলেই দেবে একখানা মামলা, শেষে কিছুই করতে পারবা না। আমার বিরুদ্ধে ১১৩টা মামলা। এইসব জিনিসগুলো নিয়ে জাতিসংঘ থেকে সবার কাছে বলা দরকার, ফলস মামলা দিচ্ছে। আমার পরিবারের কেউ বাকি নাই। সবার নামে মামলা।”
এছাড়া, ২৯ আগস্ট প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, শেখ হাসিনাকে গাজিয়াবাদ থেকে দিল্লি স্থানান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গভীর রাতে হেলিকপ্টারে দিল্লির কোনও গোপন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। স্থানটির সঠিক নাম এখনও নিশ্চিত করা যায়নি।
এই কথোপকথন এবং তার পরবর্তী ঘটনা প্রমাণ করে যে শেখ হাসিনা ও তার দলের বর্তমান অবস্থান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে থাকলেও তারা পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন। তানভীরের সহায়তার মাধ্যমে দলের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা, নির্বাচনী ক্যাম্পেইনিংয়ে অংশগ্রহণ, এবং তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা প্রাপ্তির চেষ্টা – এসবই বর্তমান পরিস্থিতির জটিলতার মুখে শেখ হাসিনার কৌশলগত সিদ্ধান্তের অংশ।
